Header Ads

”খেজুর গাছের আসল আকর্ষণ রস, এটাই এই দেশের যশ”

     রসই খেজুর গাছের আসল আকর্ষণ। আশ্বিন মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহ (অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি) পর্যন্ত চলে রস সংগ্রহের কাজ। আবহাওয়া ঠান্ডা, আকাশ মেঘলা ও কুয়াশাময় থাকলে রসের পরিমান বেশী মেলে, স্বাদও তুলোনামুলক বেশী থাকে। আর স্বাধ যত বেশী হয় রস থেকে যে গুড় তৈরি হয় সেটার স্বাধ ও বেশী হয়।এবং রসের ঘনাত্ব বেশী থাকে।

পৌষ-মাঘ মাসে (ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি) তাই সবচেয়ে বেশী রস পাওয়া যায়। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে রসের পরিমাণ ও স্বাধ কমতে থাকে। রস সংগ্রহ শুরু করা হয় গাছের বয়ন যখন ৫ বছর । গাছের বয়স, এলাকা বা মাটির প্রকারভেদ ছাড়াও একই মৌসুমের বিভিন্ন সময় ও গাছের যত্নের ওপর নির্ভর করে । পুরুষ গাছ স্ত্রী গাছের চেয়ে বেশী রস দেয়। এর রসও স্ত্রী গাছের তুলনায় বেশী মিষ্টি হয়। পুরুষ গাছ রস দেওয়ার পাশা পাশী একটি সময় এসে খেজুর ও দেয়। যদিও বাংলাদেশে যে খেজুর হয় তাতে যথেষ্ট শাঁস থাকে না বলে অনেকেই এটা খেতে খুব একটা পছন্দ করেন না। তার পরও খেজুরের সময় গ্রামের ছোট ছোট ছেলে রা খেজুর পেড়ে মজা করে খায়। এবং বেশ আনন্দ পায়। 

 এই সম্পর্কে একটু বিস্তারিত লিখতে চাচ্ছি: 


   প্রকৃতির দান, মহান আল্লাহ তালা আমাদের সকল সৃষ্টির ভোক্তা করেছেন। শীতের আগমন আমাদের কাছে অনেক আনন্দের কারণটা গ্রাম থেকে বেশী উপলব্ধি করা যায়। যদিও বাংলাদেশ শুধু মাত্র ঐতিহ্য কথা বলে থাকি কিন্তু কাজে তেমন বান্তবায়িত হয় না। শীতের বার্তা জানান দিচ্ছে প্রকৃতির মাধ্যমে। বাঙালির শীতের দিনের অন্যতম আকর্ষণ খেজুর গুড়ের তৈরি পিঠা-পায়েস। প্রাচীন কাল থেকে অবিভক্ত ভারতে খেজুর গুড়ের জন্য যশোর জেলা বিখ্যাত ছিল। এজন্য একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে 'যশোরের যশ, খেজুরের রস।' দিন বদলের সাথে যশোরের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শুধু পরিবর্তন হয়নি খেজুরের রস সংগ্রহ এবং গুড়-পাটালি তৈরির পদ্ধতি। আজও সেই দৃশ্য গ্রামের বয়েস যষ্টরা এমনটি করে আসছেন। যাদের কারণে আমরা সাধ নিতে পারে খেজুরের গুড়ের।

     শীত মৌসুমের আগমনে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য প্রাথমিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে গাছিরা । যারা খেজুর গাছকে রসের উপযুক্ত করে গড়ে তোলে তাদেরকে আমারা গাছিরা বলে থাকি। গাছিরা গাছ গুলো বিশেষ নিয়ম এর মাধ্যমে করে থাকে। প্রথমে খেজুর গাছের মাথা পরিষ্কার করেন। এরপর শুরু হয় রস সংগ্রহ। চিরাচরিত সনাতন পদ্ধতিতে মাটির ভাঁড়ে রাতভর রস সংগ্রহ করা হয়। ভোরের সূর্য ওঠার আগে গাছিরা রস ভর্তি মাটির ভাঁড় গাছ থেকে নামিয়ে পরে মাটির হাড়িতে কিংবা টিনের বড় হাড়িতে জ্বালিয়ে গুড়-পাটালি তৈরি করে। যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ইতিমধ্যে গাছিরা খেজুর গাছ তোলা চাচার কাজ শুরু করেছে। অল্প দিনের মধ্যে বাজারে নতুন খেজুর গুড়-পাটালি পাওয়া যাবে। গ্রাম-বাংলায় এখন চোখে পড়ছে খেজুর গাছ তোলা-চাচার দৃশ্য।

     গাছিরা এখন মহা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। কিছুদিন পরই গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষ থেকে সুমধুর রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে শুরু হবে গুড়-পাটালি তৈরির উৎসব। গ্রামে গ্রামে খেজুরের রস জ্বালিয়ে পিঠা, পায়েস, মুড়ি-মুড়কী ও নানা রকমের মুখরোচক খাবার তৈরি করার ধুম পড়বে। সকালে এবং সন্ধ্যায় কাঁচা রস খেতে খুবই মজাদার। রসে ভেজা কাচি পোড়া পিঠার (চিতই পিঠা) স্বাদই আলাদা। নলেন, ঝোলা ও দানা গুড়ের সুমিষ্ট গন্ধেই যেন অর্ধ ভোজন। রসনা তৃপ্তিতে এর জুড়ি নেই। নলেন গুড় পাটালির মধ্যে নারিকেল কোরা, তিল ভাজা মিশালে আরো সুস্বাদু লাগে।

     যশোরের ঐতিহ্যবাহী গুড়-পাটালির ইতিহাস অনেক প্রাচীন। ব্রিটিশ আমলে খেজুর গুড় থেকে চিনি তৈরি করা হতো। এই চিনি 'ব্রাউন সুগার' নামে পরিচিত ছিল। খেজুরের রস থেকে উন্নতমানের মদও তৈরি করা হতো। এই চিনি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালান যেত। বিলেতী সাহেবেরা দলে দলে যশোর অঞ্চলে এসে চিনির কারখানা স্থাপন করে চিনির ব্যবসা করত।

    চিনির কারখানাগুলো চৌগাছা এবং কোটচাঁদপুর শহরের আশেপাশে কেন্দ্রীভূত ছিল। যশোরের ইতিহাস থেকে জানা যায় চৌগাছা এবং কোটচাঁদপুর এর আশেপাশে সে সময় প্রায় পাঁচশ' চিনি কারখানা গড়ে উঠেছিল। তখন কলকাতা বন্দর দিয়ে খেজুর গুড় থেকে উৎপাদিত চিনি রফতানি করা হতো। মূলত ১৮৯০ সালের দিকে আখ থেকে সাদা চিনি উৎপাদন শুরু হলে খেজুর গুড় থেকে তৈরি চিনির উৎপাদনে ধস নামে। একে একে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। খেজুরের গুড় থেকে চিনি তৈরি না হলেও এখন পর্যন্ত বাঙ্গালির কাছে খেজুর গুড়-পাটালির কদর কমেনি। পর্যাপ্ত গুড়, পাটালি পাওয়া দুষ্কর। মৌসুমে যা তৈরি হয় তা রীতিমত কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়। আবহমান কাল থেকে তাই বাংলায় নবান্নের উৎসব পালনে খেজুর গুড়ের কদর বেশি।

       বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে গাছিরা গাছ পরিষ্কার বা তোলা চাচার উপকরণ গাছি দা, দড়ি তৈরি সহ ভাঁড় (মাটির ঠিলে) ক্রয় ও রস জ্বালানো জায়গা ঠিক করা সহ বিভিন্ন কাজে রয়েছে ব্যতিব্যস্ত। উপজেলার বাটিকামারী গ্রামের রাইহান, চাঁদপাড়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক, বাদেখানপুর গ্রামের গিয়াস উদ্দীন, সিংহঝুলি গ্রামের রহিদুল ইসলাম জানান- গাছ কাটা, রস জ্বালানো ও গুড়, পাটালি তৈরির উপকরণের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার গত বছরের তুলনায় গুড়-পাটালির দাম দ্বিগুণ হবে। তবে বনবিভাগ জানিয়েছে, যশোর অঞ্চলে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারের বনবিভাগের উদ্যোগে খেজুর গাছ রোপণের কাজ শুরু করেছে। বৃহত্তর যশোর জেলার জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন' প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলে রোপিত হয়েছে কয়েক লাখ খেজুর গাছের চারা। তবে ইট ভাটায় খেজুর গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার সরকারিভাবে নিষিদ্ধ না করলে এক সময় খেজুর গাছ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শুধু আরব্য উপন্যাসের গল্পে পরিণত হবে।

No comments

Powered by Blogger.